রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি যখন ছোটো ছিলুম, ছিলুম তখন ছোটো;
আমার ছুটির সঙ্গী ছিল ছবি-আঁকার পোটো ৷
বাড়িটা তার ছিল বুঝি শঙ্খী নদীর মোড়ে,
নাগকন্যা আসত ঘাটে শাঁখের নৌকো চ’ড়ে ৷
চাঁপার মতো আঙুল দিয়ে বেণীর বাঁধন খুলে
ঘন কালো চুলের গুচ্ছে কী ঢেউ দিত তুলে ৷
রৌদ্র-আলোয় ঝলক দিয়ে বিন্দুবারির মতো
মাটির ’পরে পড়ত ঝরে মুক্তা মানিক কত ৷
নাগকেশরের তলায় ব’সে পদ্মফুলের কুঁড়ি
দূরের থেকে কে দিত তার পায়ের তলায় ছুঁড়ি ৷ ৷
একদিন সেই নাগকুমারী বলে উঠল, কে ও!
জবাব পেলে, দয়া ক’রে আমার বাড়ি যেয়ো ৷
রাজপ্রাসাদের দেউড়ি সেথায় শ্বেত পাথরে গাঁথা,
মণ্ডপে তার মুক্তাঝালর দোলায় রাজার ছাতা ৷
ঘোড়সওয়ারি সৈন্য সেথায় চলে পথে পথে,
রক্তবরন ধ্বজা ওড়ে তিরিশ ঘোড়ার রথে ৷
আমি থাকি মালঞ্চেতে রাজ-বাগানের মালী,
সেইখানেতে যূথীর বনে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালি ৷
রাজকুমারীর তরে সাজাই কনক-চাঁপার ডালা,
বেণীর বাঁধন-তরে গাঁথি শ্বেত করবীর মালা ৷
মাধবীতে ধরল কুঁড়ি, আর হবে না দেরি—
তুমি যদি এস তবে ফুটবে তোমায় ঘেরি ৷
উঠবে জেগে রঙন-গুচ্ছ পায়ের আসনটিতে,
সামনে তোমার করবে নৃত্য ময়ূর-ময়ূরীতে ৷
বনের পথে সারি সারি রজনীগন্ধায়
বাতাস দেবে আকুল ক’রে ফাগুনি সন্ধ্যায় ৷ ৷
বলতে বলতে মাথার উপর উড়ল হাঁসের দল,
নাগকুমারী মুখের ’পরে টানল নীলাঞ্চল ৷
ধীরে ধীরে নদীর ’পরে নামল নীরব পায়ে ৷
ছায়া হয়ে গেল কখন চাঁপা গাছের ছায়ে ৷
সন্ধ্যামেঘের সোনার আভা মিলিয়ে গেল জলে ৷
পাতল রাতি তারা-গাঁথা আসন শূন্যতলে ৷ ৷
শান্তিনিকেতন
২ মার্চ ১৯৪১
[:১৮ ফাল্গুন ’৪৭:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন