রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘন অশ্রুবাষ্পে ভরা মেঘের দুর্যোগে খড়্গ হানি
ফেলো, ফেলো টুটি ৷
হে সূর্য, হে মোর বন্ধু, জ্যোতির কনকপদ্মখানি
দেখা দিক ফুটি ৷
বহ্নিবীণা বক্ষে লয়ে দীপ্ত কেশে উদবোধিনী বাণী
সে পদ্মের কেন্দ্র-মাঝে নিত্য রাজে, জানি তারে জানি ৷
মোর জন্মকালে
প্রথম প্রত্যুষে মম তাহারি চুম্বন দিলে আনি
আমার কপালে ৷ ৷
সে চুম্বনে উচ্ছলিল জ্বালার তরঙ্গ মোর প্রাণে—
অগ্নির প্রবাহ,
উচ্ছ্বসি উঠিল মন্দ্রি বারম্বার মোর গানে গানে
শান্তিহীন দাহ ৷
ছন্দের বন্যায় মোর রক্ত নাচে সে চুম্বন লেগে,
উন্মাদ সংগীত কোথা ভেসে যায় উদ্দাম আবেগে
আপনা-বিস্মৃত ৷
সে চুম্বনমন্ত্রে বক্ষে অজানা ক্রন্দন উঠে জেগে
ব্যথায় বিস্মিত ৷ ৷
তোমার হোমাগ্নি-মাঝে আমার সত্যের আছে ছবি,
তারে নমোনম ৷
তমিস্রসুপ্তির কূলে যে বংশী বাজাও, আদিকবি,
ধ্বংস করি তম
সে বংশী আমারি চিত্ত:; রন্ধ্রে তারি উঠিছে গুঞ্জরি
মেঘে মেঘে বর্ণচ্ছটা, কুঞ্জে কুঞ্জে মাধবীমঞ্জরি,
নির্ঝরে কল্লোল—
তাহারি ছন্দের ভঙ্গে সর্ব অঙ্গে উঠিছে সঞ্চরি
জীবনহিল্লোল ৷ ৷
এ প্রাণ তোমারি এক ছিন্ন তান, সুরের তরণী—
আয়ুস্রোতোমুখে
হাসিয়া ভাসায়ে দিলে লীলাচ্ছলে, কৌতুকে ধরণী
বেঁধে নিল বুকে ৷
আশ্বিনের রৌদ্রে সেই বন্দী প্রাণ হয় বিস্ফুরিত
উৎকন্ঠার বেগে, যেন শেফালির শিশিরচ্ছুরিত
উৎসুক আলোক ৷
তরঙ্গহিল্লোলে নাচে রশ্মি তব, বিস্ময়ে-পূরিত
করে মুগ্ধ চোখ ৷ ৷
তেজের ভাণ্ডার হতে কী আমাতে দিয়েছ যে ভরে
কেই বা সে জানে!
কী জাল হতেছে বোনা স্বপ্নে স্বপ্নে নানা বর্ণডোরে
মোর গুপ্ত প্রাণে ৷
তোমার দূতীরা আঁকে ভুবন-অঙ্গনে আলিম্পনা,
মুহূর্তে সে ইন্দ্রজাল অপরূপ রূপের কল্পনা
মুছে যায় সরে ৷
তেমনি সহজ হোক হাসিকান্না ভাবনাবেদনা—
না বাঁধুক মোরে ৷ ৷
তারা সবে মিলে থাক অরণ্যের স্পন্দিত পল্লবে,
শ্রাবণবর্ষণে ৷
যোগ দিক নির্ঝরের মঞ্জীরগুঞ্জনকলরবে
উপলঘর্ষণে ৷
ঝঞ্ঝার-মদিরা-মত্ত বৈশাখের তাণ্ডবলীলায়
বৈরাগী বসন্ত যবে আপনার বৈভব বিলায়,
সঙ্গে যেন থাকে ৷
তার পরে যেন তারা সর্বহারা দিগন্তে মিলায়,
চিহ্ন নাহি রাখে ৷ ৷
হে রবি, প্রাঙ্গণে তব শরতের সোনার বাঁশিতে
জাগিল মূর্ছনা ৷
আলোতে শিশিরে বিশ্ব দিকে দিকে অশ্রুতে হাসিতে
চঞ্চল উন্মনা ৷
জানি না কী মত্ততায়, কী আহবানে আমার রাগিণী
ধেয়ে যায় অন্যমনে শূন্যপথে হয়ে বিবাগিনি
লয়ে তার ডালি ৷
সে কি তব সভাস্থলে স্বপ্নাবেশে চলে একাকিনী
আলোর কাঙালি ৷ ৷
দাও, খুলে দাও দ্বার, ওই তার বেলা হল শেষ—
বুকে লও তারে ৷
শান্তি-অভিষেক হোক, ধৌত হোক সকল আবেশ
অগ্নি-উৎসধারে ৷
সীমন্তে গোধূলিলগ্নে দিয়ো এঁকে সন্ধ্যার সিন্দূর,
প্রদোষের তারা দিয়ে লিখো রেখা আলোকবিন্দুর
তার স্নিগ্ধ ভালে ৷
দিনান্তসংগীতধ্বনি সুগম্ভীর বাজুক সিন্ধুর
তরঙ্গের তালে ৷ ৷
হারুনা-মারু জাহাজ
২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২৪
[:১০ আশ্বিন ১৩৩১:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন