রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চলেছে উজান ঠেলি তরণী তোমার,
দিকপ্রান্তে নামে অন্ধকার ৷
কোন গ্রামে যাবে তুমি, কোন ঘাটে হে বধূবেশিনী,
ওগো বিদেশিনী!
উৎসবের বাঁশিখানি কেন যে কে জানে
ভরেছে দিনান্তবেলা ম্লান মূলতানে—
তোমারে পরালো সাজ মিলি সখীদল
গোপনে মুছিয়া চক্ষুজল ৷ ৷
মৃদুস্রোত নদীখানি ক্ষীণ কলকলে
স্তিমিত বাতাসে যেন বলে—
‘কত বধূ গিয়েছিল কতকাল এই স্রোত বাহি
তীর-পানে চাহি ৷
ভাগ্যের বিধাতা কোনো কহেন নি কথা,
নিস্তব্ধ ছিলেন চেয়ে লজ্জাভয়ে-নতা
তরুণী কন্যার পানে, তরী-’পরে ছিলেন গোপনে
তরণীর কাণ্ডারীর সনে ৷’
কোন টানে জানা হতে অজানায় চলে
আধো-হাসি আধো-অশ্রুজলে ৷
ঘর ছেড়ে দিয়ে তবে ঘরখানি পেতে হয় তারে
অচেনার ধারে ৷
ও পারের গ্রাম দেখো আছে ওই চেয়ে,
বেলা ফুরাবার আগে চলো তরী বেয়ে—
ওই ঘাটে কত বধূ কত শত বর্ষ বর্ষ ধরি
ভিড়ায়েছে ভাগ্যভীরু তরী ৷ ৷
জনে জনে রচি গেল কালের কাহিনী,
অনিত্যের নিত্যপ্রবাহিণী—
জীবনের ইতিবৃত্তে নামহীন কর্ম-উপহার
রেখে গেল তার ৷
আপনার প্রাণসূত্রে যুগ যুগান্তর
গেঁথে গেঁথে চলে গেল না রাখি স্বাক্ষর,
ব্যথা যদি পেয়ে থাকে না রহিল কোনো তার ক্ষত—
লভিল মৃত্যুর সদাব্রত ৷ ৷
তাই আজি গোধূলির নিস্তব্ধ আকাশ
পথে তব বিছালো আশ্বাস ৷
কহিল সে কানে কানে, ‘প্রাণ দিয়ে ভরা যার বুক
সেই তার সুখ ৷
রয়েছে কঠোর দুঃখ, রয়েছে বিচ্ছেদ—
তবু দিন পূর্ণ হবে, রহিবে না খেদ,
যদি ব’লে যাও, বধূ, ‘আলো দিয়ে জ্বেলেছিনু আলো,
সব দিয়ে বেসেছিনু ভালো ৷’ ’
১৯ আশ্বিন ১৩৩৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন