রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খেলনা খোকার হারিয়ে গেছে, মুখটা শুকোনো ৷
মা বলে, দেখ, ওই আকাশে আছে লুকোনো ৷
খোকা শুধোয়, ঘরের থেকে গেল কী করে ৷
মা বলে যে, ওই তো মেঘের থলিটা ভ’রে
নিয়ে গেছে ইন্দ্রলোকের শাসন-ছেঁড়া ছেলে ৷
খোকা বলে, কখন এল, কখন খবর পেলে ৷
মা বললে, ওরা এল যখন সবাই মিলি
চৌধুরীদের আম-বাগানে লুকিয়ে গিয়েছিলি,
যখন ওদের ফলগুলি সব করলি বেবাক নষ্ট ৷
মেঘলা দিনে আলো তখন ছিল নাকো পষ্ট—
গাছের ছায়ার চাদর দিয়ে এসেছে মুখ ঢেকে,
কেউ আমরা জানি নে তো ক’জন তারা কে কে ৷
কুকুরটাও ঘুমোচ্ছিল লেজেতে মুখ গুঁজে,
সেই সুযোগে চুপিচুপি গিয়েছে ঘর খুঁজে ৷
আমরা ভাবি, বাতাস বুঝি লাগল বাঁশের ডালে,
কাঠবেড়ালি ছুটছে বুঝি আট-চালাটার চালে ৷
তখন দিঘির বাঁধ ছাপিয়ে ছুটছে মাঠে জল,
মাছ ধরতে হো হো রবে জুটছে মেয়ের দল;
তালের আগা ঝড়ের তাড়ায় শূন্যে মাথা কোটে,
মেঘের ডাকে জানলাগুলো খড়খড়িয়ে ওঠে ৷
ভেবেছিলুম শান্ত হয়ে পড়ছ ক্লাসে তুমি,
জানি নে তো কখন এমন শিখেছ দুষ্টুমি ৷ ৷
খোকা বলে, ওই-যে তোমার ইন্দ্রলোকের ছেলে
তাদের কেন এমনতরো দুষ্টুমিতে পেলে!
ওরা যখন নেমে আসে আম-বাগানের ’পরে—
ডাল ভাঙে আর ফল ছেঁড়ে আর কী কাণ্ডটাই করে!
আসল কথা, বাদল যেদিন বনে লাগায় দোল,
ডালে পালায় লতায় পাতায় বাধায় গণ্ডগোল,
সে দিন ওরা পড়াশুনোয় মন দিতে কি পারে—
সেদিন ছুটির মাতন লাগায় অজয়নদীর ধারে ৷
তার পরে সব শান্ত হলে ফেরে আপন দেশে—
মা তাহাদের বকুনি দেয়, গল্প শোনায় শেষে ৷ ৷
শান্তিনিকেতন
২ মার্চ ১৯৪১
[:১৮ ফাল্গুন ’৪৭:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন