রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ডাক্তারে যা বলে বলুক নাকো,
:রাখো রাখো খুলে রাখো
শিওরের ওই জানলাদুটো, গায়ে লাগুক হাওয়া ৷
ওষুধ? আমার ফুরিয়ে গেছে ওষুধ খাওয়া ৷
তিতো কড়া কত ওষুধ খেলেম এ জীবনে,
দিনে দিনে ক্ষণে ক্ষণে ৷
বেঁচে থাকা সেই যেন এক রোগ;
কতরকম কবিরাজি, কতই মুষ্টিযোগ—
একটুমাত্র অসাবধানেই বিষম কর্মভোগ ৷
এইটে ভালো, ওইটে মন্দ, যে যা বলে সবার কথা মেনে
নামিয়ে চক্ষু মাথায় ঘোমটা টেনে
বাইশ বছর কাটিয়ে দিলেম এই তোমাদের ঘরে ৷
তাই তো ঘরে পরে
সবাই আমায় বললে— লক্ষ্মী সতী,
ভালো মানুষ অতি ৷ ৷
এ সংসারে এসেছিলেম ন-বছরের মেয়ে,
তার পরে এই পরিবারের দীর্ঘ গলি বেয়ে
দশের-ইচ্ছা-বোঝাই-করা এই জীবনটা টেনে টেনে শেষে
পৌঁছিনু আজ পথের প্রান্তে এসে;
সুখের দুখের কথা
:একটুখানি ভাবব এমন সময় ছিল কোথা?
এই জীবনটা ভালো কিম্বা মন্দ কিম্বা যা-হোক-একটা কিছু
সে কথাটা বুঝব কখন, দেখব কখন ভেবে আগুপিছু?
একটানা এক ক্লান্ত সুরে
কাজের চাকা চলছে ঘুরে ঘুরে!
বাইশ বছর রয়েছি সেই এক চাকাতেই বাঁধা
পাকের ঘোরে আঁধা ৷
জানি নাই তো আমি যে কী, জানি নাই এ বৃহৎ বসুন্ধরা
কী অর্থে যে ভরা ৷
শুনি নাই তো মানুষের কী বাণী
মহাকালের বীণায় বাজে ৷ আমি কেবল জানি,
রাঁধার পরে খাওয়া আবার খাওয়ার পরে রাঁধা—
বাইশ বছর এক চাকাতেই বাঁধা ৷
মনে হচ্ছে, সেই চাকাটা ওই-যে থামল যেন—
থামুক তবে ৷ আবার ওষুধ কেন? ৷
বসন্তকাল বাইশ বছর এসেছিল বনের আঙিনায় ৷
গন্ধে-বিভোল দক্ষিণবায়
দিয়েছিল জলস্থলের মর্মদোলায় দোল;
হেঁকেছিল, ‘খোল রে দুয়ার খোল ৷’
সে যে কখন আসত যেত জানতে পেতেম না যে ৷
হয়তো মনের মাঝে
সংগোপনে দিত নাড়া; হয়তো ঘরের কাজে
আচম্বিতে ভুল ঘটাত; হয়তো বাজত বুকে
জন্মান্তরের ব্যথা; কারণ-ভোলা দুঃখে সুখে
হয়তো পরান রইত চেয়ে যেন রে কার পায়ের শব্দ শুনে
বিহ্বল ফাল্গুনে ৷
তুমি আসতে আপিস থেকে, যেতে সন্ধ্যাবেলায়
পাড়ায় কোথা সতরঞ্চ-খেলায় ৷
থাক সে কথা ৷
আজকে কেন মনে আসে প্রাণের যত ক্ষণিক ব্যাকুলতা ৷ ৷
প্রথম আমার জীবনে এই বাইশ বছর পরে
বসন্তকাল এসেছে মোর ঘরে ৷
জানলা দিয়ে চেয়ে আকাশ-পানে
আনন্দে আজ ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছে প্রাণে—
আমি নারী, আমি মহীয়সী,
আমার সুরে সুর বেঁধেছে জ্যোৎস্নাবীণায় নিদ্রাবিহীন শশী ৷
আমি নইলে মিথ্যা হ’ত সন্ধ্যাতারা-ওঠা,
মিথ্যা হ’ত কাননে ফুল-ফোটা ৷ ৷
বাইশ বছর ধ’রে
মনে ছিল, বন্দী আমি অনন্তকাল তোমাদের এই ঘরে ৷
দুঃখ তবু ছিল না তার তরে—
অসাড় মনে দিন কেটেছে, আরো কাটত আরো বাঁচলে পরে ৷
যেথায় যত জ্ঞাতি
লক্ষ্মী ব’লে করে আমার খ্যাতি;
এই জীবনে সেই যেন মোর পরম সার্থকতা—
ঘরের কোণে পাঁচের মুখের কথা ৷
আজকে কখন মোর
কাটল বাঁধন-ডোর ৷
জনম মরণ এক হয়েছে ওই-যে অকূল বিরাট মোহানায়,
ওই অতলে কোথায় মিলে যায়
ভাঁড়ার-ঘরের দেয়াল যত
একটু ফেনার মতো ৷ ৷
এতদিনে প্রথম যেন বাজে
বিয়ের বাঁশি বিশ্ব-আকাশ-মাঝে ৷
তুচ্ছ বাইশ বছর আমার ঘরের কোণের ধুলায় পড়ে থাক ৷
মরণ-বাসর-ঘরে আমায় যে দিয়েছে ডাক
দ্বারে আমার প্রার্থী সে যে, নয় সে কেবল প্রভু—
হেলা আমায় করবে না সে কভু ৷
চায় সে আমার কাছে
আমার মাঝে গভীর গোপন যে সুধারস আছে ৷
গ্রহতারার সভার মাঝারে সে
ওই-যে আমার মুখে চেয়ে দাঁড়িয়ে হোথায় রইল নির্নিমেষে ৷
মধুর ভুবন মধুর আমি নারী,
মধুর মরণ, ওগো আমার অনন্ত ভিখারী,
দাও খুলে দাও দ্বার—
ব্যর্থ বাইশ বছর হতে পার করে দাও কালের পারাবার ৷ ৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন