রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাকুড়তলির মাঠে
বামুন-মারা দিঘির ঘাটে
আদিবিশ্ব-ঠাকুরমায়ের আশমানি এক চেলা
ঠিকদুক্ষুর বেলা
বেগনি-সোনা দিক-আঙিনার কোণে
বসে বসে ভুঁইজোড়া এক চাটাই বোনে
হলদে রঙের শুকনো ঘাসে ৷
সেখান থেকে ঝাপসা স্মৃতির কানে আসে
ঘুম-লাগা রোদদুরে ঝিমঝিমিনি সুরে—
‘ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালে বিলে,
সুন্দরীকে বিয়ে দিলেম ডাকাত-দলের মেলে ৷’
সুদূর কালের দারুণ ছড়াটিকে
স্পষ্ট করে দেখি নে আজ, ছবিটা তার ফিকে ৷
মনের মধ্যে বেঁধে না তার ছুরী,
সময় তাহার ব্যথার মূল্য সব করেছে চুরি ৷
বিয়ের পথে ডাকাত এসে হরণ করলে মেয়ে,
এই বারতা ধুলোয়-পড়া শুকনো পাতার চেয়ে
উত্তাপহীন, ঝেঁটিয়ে-ফেলা আবর্জনার মতো ৷
দুঃসহ দিন দুঃখেতে বিক্ষত,
এই কটা তার শব্দমাত্র দৈবে রইল বাকি
আগুন-নেভা ছাইয়ের মতন ফাঁকি ৷
সেই মরা দিন কোন খবরের টানে
পড়ল এসে সজীব বর্তমানে ৷
তপ্ত হাওয়ার বাজপাখি আজ বারে বারে
ছোঁ মেরে যায় ছড়াটারে,
এলোমেলো ভাবনাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে
টুকরো করে ওড়ায় ধ্বনিটাকে ৷
জাগা মনের কোন কুয়াশা স্বপ্নেতে যায় ব্যেপে,
ধোঁওয়াটে এক কম্বলেতে ঘুমকে ধরে চেপে;
রক্তে নাচে ছড়ার ছন্দে মিলে—
ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালে বিলে ৷ ৷
জমিদারের বুড়ো হাতি হেলেদুলে চলেছে বাঁশতলায়,
ঢঙঢঙিয়ে ঘণ্টা দোলে গলায় ৷ ৷
বিকেলবেলায় চিকন আলোর আভাস লেগে
ঘোলা রঙের আলস ভেঙে উঠি জেগে ৷
হঠাৎ দেখি বুকে বাজে টনটনানি
পাঁজরগুলোর তলায় তলায় ব্যথা হানি
চটকা ভাঙে যেন খোঁচা খেয়ে,
কই আমাদের পাড়ার কালো মেয়ে—
ঝুরি ভ’রে মুড়ি আনত, আনত পাকা জাম,
সামান্য তার দাম;
ঘরের গাছের আম আনত কাঁচামিঠা,
আনির স্থলে দিতেম তাকে চার-আনিটা ৷
ওই-যে অন্ধ কলুবুড়ির কান্না শুনি—
ক’দিন হল জানি নে কোন গোঁয়ার খুনি
সমত্থ তার নাৎনিটিকে
কেড়ে নিয়ে ভেগেছে কোন দিকে ৷
আজ সকালে শোনা গেল চৌকিদারের মুখে,
যৌবন তার দ’লে গেছে, জীবন গেছে চুকে ৷
বুক-ফাটানো এমন খবর জড়ায়
সেই সেকালের সামান্য এক ছড়ায় ৷
শাস্ত্রমানা আস্তিকতা ধুলোতে যায় উড়ে—
‘উপায় নাই রে নাই প্রতিকার’ বাজে আকাশ জুড়ে ৷
অনেক কালের শব্দ আসে ছড়ার ছন্দে মিলে—
ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালে বিলে ৷ ৷
জমিদারের বুড়ো হাতি হেলেদুলে চলেছে বাঁশতলায়,
ঢঙঢঙিয়ে ঘণ্টা দোলে গলায় ৷ ৷
শান্তিনিকেতন ৷ ২৮ মার্চ ১৯৩৯
[:১৪ চৈত্র ’৪৫:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন