রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছিলাম নিশিদিন আশাহীন প্রবাসী
বিরহতপোবনে আনমনে উদাসী ৷
আঁধারে আলো মিশে দিশে দিশে খেলিত,
অটবী বায়ুবশে উঠিত সে উছাসি ৷
কখনো ফুল-দুটো আঁখিপুট মেলিত,
কখনো পাতা ঝ’রে পড়িত রে নিশাসি ৷ ৷
তবু সে ছিনু ভালো আধা-আলো-আঁধারে,
গহন শত-ফের বিষাদের মাঝারে ৷
নয়নে কত ছায়া কত মায়া ভাসিত,
উদাস বায়ু সে তো ডেকে যেত আমারে ৷
ভাবনা কত সাজে হৃদিমাঝে আসিত,
খেলাত অবিরত কত শত আকারে ৷ ৷
বিরহপরিপূত ছায়াযুত শয়নে
ঘুমের সাথে স্মৃতি আসে নিতি নয়নে ৷
কপোত-দুটি ডাকে বসি শাখে মধুরে,
দিবস চলে যায় গলে যায় গগনে ৷
কোকিল কুহুতানে ডেকে আনে বধূরে,
নিবিড় শীতলতা তরুলতা- গহনে ৷ ৷
আকাশে চাহিতাম, গাহিতাম একাকী—
মনের যত কথা ছিল সেথা লেখা কি!
দিবস-নিশি ধ’রে ধ্যান ক’রে তাহারে
নীলিমা-পরপার পাব তার দেখা কি!
তটিনী অনুখন ছোটে কোন পাথারে,
আমি যে গান গাই তারি ঠাঁই শেখা কি? ৷
বিরহে তারি নাম শুনিতাম পবনে,
তাহারি সাথে থাকা মেঘে-ঢাকা ভবনে ৷
পাতার মরমর কলেবর হরষে,
তাহারি পদধ্বনি যেন গণি কাননে ৷
মুকুল সুকুমার যেন তার পরশে,
চাঁদের চোখে ক্ষুধা তারি সুধা- স্বপনে ৷ ৷
সারাটা দিনমান রচি গান কত-না,
তাহারি পাশে রহি যেন কহি বেদনা ৷
কানন মরমরে কত স্বরে কহিত,
ধ্বনিত যেন দিশে তাহারি সে রচনা ৷
সতত দূরে কাছে আগে পাছে বহিত
তাহারি যত কথা পাতা লতা ঝরনা ৷ ৷
তাহারে আঁকিতাম, রাখিতাম ধরিয়া
বিরহছায়াতল সুশীতল করিয়া ৷
কখনো দেখি যেন ম্লান-হেন মুখানি,
কখনো আঁখিপুটে হাসি উঠে ভরিয়া ৷
কখনো সারারাত ধরি হাত- দুখানি
রহি গো বেশবাশে কেশপাশে মরিয়া ৷ ৷
বিরহ সুমধুর হল দূর কেন রে!
মিলনদাবানলে গেল জ্বলে যেন রে ৷
কই সে দেবী কই! হেরো ওই একাকার,
শ্মশানবিলাসিনী বিবাসিনী বিহরে ৷
নাই গো দয়ামায়া স্নেহছায়া নাহি আর ৷
সকলই করে ধু-ধু, প্রাণ শুধু শিহরে ৷ ৷
জ্যৈষ্ঠ ১২৯৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন