রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খেঁদুবাবুর এঁধো পুকুর, মাছ উঠেছে ভেসে;
পদ্মমণি চচ্চড়িতে লঙ্কা দিল ঠেসে ৷
আপনি এল ব্যাকটিরিয়া, তাকে ডাকা হয় নাই,
হাঁসপাতালের মাখন ঘোষাল বলেছিল, ‘ভয় নাই!’
সে বলে, ‘সব বাজে কথা, খাবার জিনিস খাদ্য ৷’
দশ দিনেতেই ঘটিয়ে দিল দশ জনারই শ্রাদ্ধ!
শ্রাদ্ধের যে ভোজন হবে কাঁচা তেঁতুল দরকার,
বেগুন-মুলোর সন্ধানেতে ছুটল ন্যাড়া সরকার ৷
বেগুন-মুলো পাওয়া যাবে নিলফামারির বাজারে;
নগদ দামে বিক্রি করে, তিন টাকা দাম হাজারে ৷
দুমকাতে লোক পাঠিয়েছিল, বানিয়ে দেবে মুড়কি;
সন্দেহ হয়, ওজন-মত মিশল তাতে গুড় কি ৷
সর্ষে যে চাই মোন দু-তিনেক ঝোলে ঝালে বাটনায়;
কালুবাবু তারি খোঁজে গেলেন ধেয়ে পাটনায় ৷
বিষম খিদেয় করল চুরি রামছাগলের দুধ,
তারি সঙ্গে মিশিয়ে নিলে গম-ভাঙানির খুদ ৷
ওই শোনা যায় রেডিয়োতে বোঁচা গোঁফের হুমকি—
দেশ-বিদেশে শহর-গ্রামে গলা কাটার ধুম কী!
খাঁচায়-পোষা চন্দনাটা ফড়িঙে পেট ভরে;
সকাল থেকে নাম করে গান— হরে কৃষ্ণ হরে ৷ ৷
বালুর চরে আলুহাটা, হাতে বেতের চুপড়ি,
ক্ষেতের মধ্যে ঢুকে কালু মুলো নিল উপড়ি ৷
নদীর পাড়ে কিচির-মিচির লাগালো গাঙশালিক যে,
অকারণে ঢোলক বাজায় মুলোক্ষেতের মালিক যে ৷
কাঁকুড়-ক্ষেতে মাচা বাঁধে পিলেওয়ালা ছোকরা,
বাঁশের বনে কঞ্চি কাটে মুচিপাড়ার লোকরা ৷
পাটনাতে নীলকুঠির গঞ্জে খেয়া চালায় পাটনি,
রোদে জলে নিতুই চলে চার পহরের খাটনি,
কড়াপড়া কঠিন হাতে মাজা কাঁসার কাঁকনটা,
কপালে তার পত্রলেখা উল্কি-দেওয়া আঁকনটা ৷
কুচোমাছের টুকরি থেকে চিলেতে নেয় ছোঁ মেরে—
মেছনি তার সাত গুষ্টি উদ্দেশে দেয় যমেরে ৷
ও পারেতে খড়্গপুরে কাঠি পড়ে বাজনায়,
মুন্সিবাবু হিসেব ভোলে জমিদারের খাজনায় ৷
রেডিয়োতে খবর জানায় বোমায় করলে ফুটো,
সমুদদুরে তলিয়ে গেল মালের জাহাজ দুটো ৷
খাঁচার মধ্যে ময়না থাকে; বিষম কলরবে
ছাতু ছড়ায়, মাতায় পাড়া আত্মারামের স্তবে ৷ ৷
হুইসল দিল প্যাসেঞ্জারে; সাঁতরাগাছির ড্রাইভার
মাথায় মোছে হাতের কালি, সময় না পায় নাইবার ৷
ননদ গেল ঘুঘুডাঙায়, সঙ্গে গেল চিন্তে—
লিলুয়াতে নেমে গেল ঘুড়ির লাটাই কিনতে ৷
লিলুয়াতে খইয়ের মোওয়া চার ধামা হয় বোঝাই,
দাম দিতে হায় টাকার থলি মিথ্যে হল খোঁজাই ৷
ননদ পরল রাঙা চেলি, পাল্কি চড়ে চলল,
পাড়ায় পাড়ায় রব উঠেছে গায়ে হলুদ কল্য ৷
কাহারগুলো পাগড়ি বাঁধে, বাঁদি পরে ঘাঘরা ৷
জমাদারের মামা পড়ে শুঁড়-তোলা তার নাগরা ৷
পাঁড়েজি তাঁর খড়ম নিয়ে চলেন খটাৎ খটাৎ;
কোথা থেকে ধোবার গাধা চেঁচিয়ে ওঠে হঠাৎ ৷
খয়রাডাঙার ময়রা আসে, কিনে আনে ময়দা;
পচা ঘিয়ের গন্ধ ছড়ায়— যমালয়ের পয়দা ৷
আকাশ থেকে নামল বোমা, রেডিয়ো তাই জানায়—
অপঘাতে বসুন্ধরা ভরল কানায় কানায় ৷
খাঁচার মধ্যে শ্যামা থাকে ; ছিরকুটে খায় পোকা,
শিস দেয় সে মধুর স্বরে— হাততালি দেয় খোকা ৷ ৷
হুইসল বাজে ইসটিশনে, বরের জ্যাঠামশাই
চমকে ওঠে— গেলেন কোথায় অগ্রদ্বীপের গোঁসাই!
সাঁতরাগাছির নাচনমণি কাটতে গেল সাঁতার,
হায় রে কোথায় ভাসিয়ে দিল সোনার সিঁথি মাথার ৷
মোষের শিঙে ব’সে ফিঙে লেজ দুলিয়ে নাচে—
শুধোয় নাচন, ‘সিঁথি আমার নিয়েছে কোন মাছে?’
মাছের লেজের ঝাপটা লাগে, শালুক ওঠে দুলে;
রোদ পড়েছে নাচনমণির ভিজে চিকন চুলে ৷
কোথায় ঘাটের ফাটল থেকে ডাকল কোলা ব্যাঙ,
খড়্গপুরের ঢাকে ঢোলে বাজল ড্যাড্যাঙ ড্যাঙ ৷
কাঁপছে ছায়া আঁকাবাঁকা, কলমিপাড়ের পুকুর—
জল খেতে যায় এক-পা-কাটা তিন-পেয়ে এক কুকুর ৷
হুইসল বাজে— আছে সেজে পাইকপাড়ার পাত্রী,
শেয়ালকাঁটার বন পেরিয়ে চলে বিয়ের যাত্রী ৷
গ্যাঁ গ্যাঁ করে রেডিয়োটা— কে জানে কার জিত,
মেশিনগানে গুঁড়িয়ে দিল সভ্যবিধির ভিত ৷
টিয়ের মুখে বুলি শুনে হাসছে ঘরে পরে—
রাধে কৃষ্ণ, রাধে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে ৷ ৷
দিন চলে যায় গুনগুনিয়ে ঘুমপাড়ানির ছড়া;
শান-বাঁধানো ঘাটের ধারে নামছে কাঁখের ঘড়া ৷
আতাগাছের তোতাপাখি, ডালিমগাছের মউ;
হীরেদাদার মড়মড়ে থান, ঠাকুরদাদার বউ ৷
পুকুরপাড়ে জলের ঢেউয়ে দুলছে ঝোপের কেয়া,
পাটনি চালায় ভাঙা ঘাটে তালের ডোঙার খেয়া ৷
খোকা গেছে মোষ চরাতে, খেতে গেছে ভুলে—
কোথায় গেল গমের রুটি শিকের ’পরে তুলে ৷
আমার ছড়া চলেছে আজ রূপকথাটা ঘেঁষে,
কলম আমার বেরিয়ে এল বহুরূপীর বেশে ৷
আমরা আছি হাজার বছর ঘুমের ঘোরের গাঁয়ে,
আমরা ভেসে বেড়াই স্রোতের শেওলা-ঘেরা-নায়ে ৷
কচি কুমড়োর ঝোল বাঁধা হয়, জোড়-পুতুলের বিয়ে;
বাঁধা বুলি ফুকরে ওঠে কমলাপুলির টিয়ে ৷
ছাইয়ের গাদায় ঘুমিয়ে থাকে পাড়ার খেঁকি কুকুর,
পান্তিহাটে বেতো ঘোড়া চলে টুকুর-টুকুর ৷
তালগাছেতে হুতোমথুমো পাকিয়ে আছে ভুরু,
তক্তিমালা হড়মবিবির গলাতে সাত-পুরু ৷
আধেক জাগায় আধেক ঘুমে ঘুলিয়ে আছে হাওয়া,
দিনের রাতের সীমানাটা পেঁচোয়-দানোয়-পাওয়া ৷
ভাগ্যলিখন ঝাপসা কালির, নয় সে পরিষ্কার—
দুঃখসুখের ভাঙা বেড়ায় সমান যে দুই ধার ৷
কামারহাটার কাঁকুড়্গাছির ইতিহাসের টুকরো
ভেসে চলে ভাঁটার জলে উইয়ে-ঘুণে-ফুকরো!
অঘটন তো নিত্য ঘটে রাস্তাঘাটে চলতে—
লোকে বলে ‘সত্যি নাকি’— ঘুমোয় বলতে বলতে ৷ ৷
সিন্ধুপারে চলছে হোথায় উলট-পালট কাণ্ড,
হাড় গুঁড়িয়ে বানিয়ে দিলে নতুন কী ব্রহ্মাণ্ড!
সত্য সেথায় দারুণ সত্য, মিথ্যে ভীষণ মিথ্যে;
ভালোয় মন্দে সুরাসুরের ধাক্কা লাগায় চিত্তে ৷
পা ফেলতে না ফেলতেই হতেছে ক্রোশ পার—
দেখতে দেখতে কখন যে হয় এসপার ওসপার ৷ ৷
শান্তিনিকেতন
১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ [:৪ ফাল্গুন ’৪৬:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন