রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জ্যোতির্ময় তীর হতে আঁধারসাগরে
ঝাঁপায়ে পড়িল এক তারা,
একেবারে উন্মাদের পারা।
চৌদিকে অসংখ্য তারা রহিল চাহিয়া
অবাক হইয়া—
এই-যে জ্যোতির বিন্দু আছিল তাদের মাঝে
মুহূর্তে সে গেল মিশাইয়া।
যে সমুদ্রতলে
মনোদুঃখে আত্মঘাতী
চির-নির্বাপিত-ভাতি
শত মৃত তারকার
মৃতদেহ রয়েছে শয়ান
সেথায় সে করেছে পয়ান।
কেন গো, কী হয়েছিল তার।
একবার শুধালে না কেহ—
কী লাগি সে তেয়াগিল দেহ।
যদি কেহ শুধাইত
আমি জানি কী যে সে কহিত।
যতদিন বেঁচে ছিল
আমি জানি কী তারে দহিত।
সে কেবল হাসির যন্ত্রণা,
আর কিছু না।
জ্বলন্ত অঙ্গারখন্ড ঢাকিতে আঁধার হৃদি
অনিবার হাসিতেই রহে,
যত হাসে ততই সে দহে।
তেমনি, তেমনি তারে হাসির অনল
দারুণ উজ্জ্বল—
দহিত, দহিত তারে, দহিত কেবল।
জ্যোতির্ময় তারাপূর্ণ বিজন তেয়াগি
তাই আজ ছুটেছে সে নিতান্ত মনের ক্লেশে
আঁধারের তারাহীন বিজনের লাগি।
কেন গো, তোমরা যত তারা
উপহাস করি তারে হাসিছ অমন ধারা।
তোমাদের হয় নি তো ক্ষতি,
যেমন আছিল আগে তেমনি রয়েছে জ্যোতি।
সে কি কভু ভেবেছিল মনে—
(এত গর্ব আছিল কি তার?)
আপনারে নিভাইয়া তোমাদের করিবে আঁধার?
গেল, গেল, ডুবে গেল, তারা এক ডুবে গেল,
আঁধারসাগরে—
গভীর নিশীথে
অতল আকাশে।
হৃদয়, হৃদয় মোর, সাধ কি রে যায় তোর
ঘুমাইতে ওই মৃত তারাটির পাশে
ওই আঁধারসাগরে—
এই গভীর নিশীথে
ওই অতল আকাশে।
জ্যৈষ্ঠ ১২৮৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন