রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই শহরে এই তো প্রথম আসা ৷
আড়াইটা রাত, খুঁজে বেড়াই কোন ঠিকানায় বাসা ৷
লন্ঠনটা ঝুলিয়ে হাতে আন্দাজে যাই চলি
অজগরের ভূতের মতন গলির পরে গলি ৷
ধাঁধা ক্রমেই বেড়ে ওঠে, এক জায়গায় থেমে
দেখি পথের বাঁ দিক থেকে ঘাট গিয়েছে নেমে ৷
আঁধার-মুখোশ-পরা বাড়ি সামনে আছে খাড়া—
হাঁ-করা-মুখ দুয়ারগুলো, নাইকো শব্দসাড়া ৷
চৌতালাতে একটা ধারে জানলাখানার ফাঁকে
প্রদীপশিখা ছুঁচের মতো বিঁধছে আঁধারটাকে ৷
বাকি মহল যত
কালো মোটা ঘোমটা দেওয়া দৈত্যনারীর মতো ৷
বিদেশীর এই বাসাবাড়ি— কেউ বা কয়েক মাস
এইখানে সংসার পেতেছে, করছে বসবাস;
কাজকর্ম সাঙ্গ করি কেউ বা কয়েক দিনে
চুকিয়ে ভাড়া কোনখানে যায়, কেই বা তাদের চিনে!
শুধাই আমি, ‘আছ কি কেউ, জায়গা কোথায় পাই?’
মনে হল জবাব এল, ‘আমরা না ই নাই ৷’
সকল দুয়োর জানলা হতে যেন আকাশ জুড়ে
ঝাঁকে ঝাঁকে রাতের পাখি শূন্যে চলল উড়ে ৷
একসঙ্গে চলার বেগে হাজার পাখা তাই
অন্ধকারে জাগায় ধ্বনি, ‘আমরা না ই নাই ৷’
আমি শুধাই, ‘কিসের কাজে এসেছ এইখানে?’
জবাব এল, ‘সেই কথাটা কেহই নাহি জানে ৷
যুগে যুগে বাড়িয়ে চলি নেই-হওয়াদের দল,
বিপুল হয়ে ওঠে যখন দিনের কোলাহল
সকল কথার উপরেতে চাপা দিয়ে যাই—
না ই না ই নাই ৷’
পরের দিনে সেই বাড়িতে গেলেম সকালবেলা—
ছেলেরা সব পথে করছে লড়াই-লড়াই খেলা,
কাঠি হাতে দুই পক্ষের চলছে ঠকাঠকি ৷
কোণের ঘরে দুই বুড়োতে বিষম বকাবকি—
বাজি-খেলায় দিনে দিনে কেবল জেতা-হারা,
দেনা-পাওনা জমতে থাকে, হিসাব হয় না সারা ৷
গন্ধ আসছে রান্নাঘরের, শব্দ বাসন-মাজার;
শূন্য ঝুড়ি দুলিয়ে হাতে ঝি চলেছে বাজার ৷
একে একে এদের সবার মুখের দিকে চাই,
কানে আসে রাত্রিবেলার ‘আমরা না ই নাই ৷’
আলমোড়া
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন