রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিরল তোমার ভবনখানি পুষ্পকানন-মাঝে,
হে কল্যাণী, নিত্য আছ আপন গৃহকাজে ৷
বাইরে তোমার আম্রশাখে স্নিগ্ধরবে কোকিল ডাকে,
ঘরে শিশুর কলধ্বনি আকুল হর্ষভরে ৷
সর্বশেষের গানটি আমার আছে তোমার তরে ৷ ৷
প্রভাত আসে তোমার দ্বারে পূজার সাজি ভরি,
সন্ধ্যা আসে সন্ধ্যারতির বরণডালা ধরি ৷
সদা তোমার ঘরের মাঝে নীরব একটি শঙ্খ বাজে,
কাঁকন-দুটির মঙ্গলগীত উঠে মধুর স্বরে ৷
সর্বশেষের গানটি আমার আছে তোমার তরে ৷ ৷
রূপসীরা তোমার পায়ে রাখে পূজার থালা,
বিদুষীরা তোমার গলায় পরায় বরমালা ৷
ভালে তোমার আছে লেখা পুণ্যধামের রশ্মিরেখা,
সুধাস্নিগ্ধ হৃদয়খানি হাসে চোখের ’পরে ৷
সর্বশেষের গানটি আমার আছে তোমার তরে ৷ ৷
তোমার নাহি শীত বসন্ত, জরা কি যৌবন,
সর্বঋতু সর্ব কালে তোমার সিংহাসন ৷
নিভে নাকো প্রদীপ তব, পুষ্প তোমার নিত্য নব,
অচলা শ্রী তোমায় ঘেরি চির বিরাজ করে ৷
সর্বশেষের গানটি আমার আছে তোমার তরে ৷ ৷
নদীর মতো এসেছিলে গিরিশিখর হতে,
নদীর মতো সাগর-পানে চল অবাধ স্রোতে ৷
একটি গৃহে পড়ছে লেখা সেই প্রবাহের গভীর রেখা,
দীপ্ত শিরে পুণ্যশীতল তীর্থসলিল ঝরে ৷
সর্বশেষের গানটি আমার আছে তোমার তরে ৷ ৷
তোমার শান্তি পান্থজনে ডাকে গৃহের পানে,
তোমার প্রীতি ছিন্ন জীবন গেঁথে গেঁথে আনে ৷
আমার কাব্যকুঞ্জবনে কত অধীর সমীরণে
কত যে ফুল, কত আকুল মুকুল খ’সে পড়ে—
সর্বশেষের শ্রেষ্ঠ যে গান আছে তোমার তরে ৷ ৷
[শিলাইদহ]
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন