রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে বসন্ত, হে সুন্দর, ধরণীর-ধ্যান-ভরা ধন,
বৎসরের শেষে
শুধু একবার মর্তে মূর্তি ধর ভুবনমোহন
নববরবেশে ৷
তারি লাগি তপস্বিনী কী তপস্যা করে অনুক্ষণ—
আপনারে তপ্ত করে, ধৌত করে, ছাড়ে আভরণ,
ত্যাগের সর্বস্ব দিয়ে ফল-অর্ঘ্য করে আহরণ
তোমার উদ্দেশে ৷ ৷
সূর্যপ্রদক্ষিণ করি ফিরে সে পূজার নৃত্যতালে
ভক্ত উপাসিকা ৷
নম্র ভালে আঁকে তার প্রতিদিন উদয়াস্তকালে
রক্তরশ্মিটিকা ৷
সমুদ্রতরঙ্গে সদা মন্দ্রস্বরে মন্ত্র পাঠ করে,
উচ্চারে নামের শ্লোক অরণ্যের উচ্ছ্বাসে মর্মরে,
বিচ্ছেদের মরুশূন্যে স্বপ্নচ্ছবি দিকে দিগন্তরে
রচে মরীচিকা ৷ ৷
আবর্তিয়া ঋতুমাল্য করে জপ, করে আরাধন
দিন গুনে গুনে ৷
সার্থক হল যে তার বিরহের বিচিত্র সাধন
মধুর ফাল্গুনে ৷
হেরিনু উত্তরী তব, হে তরুণ, অরুণ আকাশে,
শুনিনু চরণধ্বনি দক্ষিণের বাতাসে বাতাসে,
মিলনমাঙ্গল্যহোম প্রজ্বলিত পলাশে পলাশে
রক্তিম আগুনে ৷ ৷
তাই আজি ধরিত্রীর যত কর্ম, যত প্রয়োজন
হল অবসান ৷
বৃক্ষশাখা রিক্তভার, ফলে তার নিরাসক্ত মন—
ক্ষেতে নাই ধান ৷
বকুলে বকুলে শুধু মধুকর উঠিছে গুঞ্জরি,
অকারণ আন্দোলনে চঞ্চলিছে অশোকমঞ্জরি,
কিশলয়ে কিশলয়ে নৃত্য উঠে দিবসশর্বরী,
বনে জাগে গান ৷ ৷
হে বসন্ত, হে সুন্দর, হায় হায়, তোমার করুণা
ক্ষণকাল-তরে ৷
মিলাইবে এ উৎসব, এই হাসি, এই দেখাশুনা
শূন্য নীলাম্বরে ৷
নিকুঞ্জের বর্ণচ্ছটা একদিন বিচ্ছেদবেলায়
ভেসে যাবে বৎসরান্তে রক্তসন্ধ্যা স্বপ্নের ভেলায়,
বনের মঞ্জীরধ্বনি অবসন্ন হবে নিরালায়
শ্রান্তিক্লান্তিভরে ৷ ৷
তোমারে করিবে বন্দী নিত্যকাল মৃত্তিকাশৃঙ্খলে
শক্তি আছে কার?
ইচ্ছায় বন্ধন লও, সে বন্ধন ইন্দ্রজালবলে
কর অলংকার ৷
সে বন্ধন দোলরজ্জু স্বর্গে মর্তে দোলে ছন্দভরে,
সে বন্ধন শ্বেতপদ্ম বাণীর মানসসরোবরে,
সে বন্ধন বীণাতন্ত্র সুরে সুরে সংগীতনির্ঝরে
বর্ষিছে ঝংকার ৷ ৷
নন্দনে আনন্দ তুমি, এই মর্তে, হে মর্তের প্রিয়,
নিত্য নাই হলে,
সুদূর মাধুর্য-পানে তব স্পর্শ, অনির্বচনীয়,
দ্বার যদি খোলে—
ক্ষণে ক্ষণে সেথা আসি নিস্তব্ধ দাঁড়াবে বসুন্ধরা,
লাগিবে মন্দাররেণু শিরে তার ঊর্ধ্ব হতে ঝরা,
মাটির বিচ্ছেদপাত্র স্বর্গের উচ্ছ্বাস-রসে-ভরা
রবে তার কোলে ৷ ৷
[:শান্তিনিকেতন:]
২৮ ফাল্গুন ১৩৩৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন