রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না ৷
অমন সুধাকরুণ সুরে গেয়ো না ৷
সকালবেলা সকল কাজে আসিতে যেতে পথের মাঝে
আমারি এই আঙিনা দিয়ে যেয়ো না ৷
অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না ৷ ৷
মনের কথা রেখেছি মনে যতনে ৷
ফিরিছ মিছে মাগিয়া সেই রতনে ৷
তুচ্ছ অতি, কিছু সে নয়— দুচারি-ফোঁটা-অশ্রু-ময়
একটি শুধু শোণিতরাঙা বেদনা ৷
অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না ৷ ৷
কাহার আশে দুয়ারে কর হানিছ!
না জানি তুমি কী মোরে মনে মানিছ ৷
রয়েছি হেথা লুকাতে লাজ, নাহিকো মোর রানীর সাজ—
পরিয়া আছি জীর্ণচীর বাসনা ৷
অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না ৷ ৷
কী ধন তুমি এনেছ ভরি দু হাতে?
অমন করি যেয়ো না ফেলি ধুলাতে ৷
এ ঋণ যদি শুধিতে চাই কী আছে হেন, কোথায় পাই—
জনমতরে বিকাতে হবে আপনা ৷
অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না ৷ ৷
ভেবেছি মনে, ঘরের কোণে রহিব ৷
গোপন দুখ আপন বুকে বহিব ৷
কিসের লাগি করিব আশা— বলিতে চাহি, নাহিকো ভাষা—
রয়েছে সাধ, না জানি তার সাধনা ৷
অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না ৷ ৷
যে সুর তুমি ভরেছ তব বাঁশিতে
উহার সাথে আমি কি পারি গাহিতে!
গাহিতে গেলে ভাঙিয়া গান উছলি উঠে সকল প্রাণ,
না মানে রোধ অতি অবোধ রোদনা ৷
অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না ৷ ৷
এসেছ তুমি গলায় মালা ধরিয়া,
নবীনবেশ শোভনভূষা পরিয়া ৷
হেথায় কোথা কনকথালা, কোথায় ফুল, কোথায় মালা—
বাসরসেবা করিবে কেবা রচনা!
অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না ৷ ৷
ভুলিয়া পথ এসেছ, সখা, এ ঘরে—
অন্ধকারে মালা-বদল কে করে!
সন্ধ্যা হতে কঠিন ভুঁয়ে একাকী আমি রয়েছি শুয়ে,
নিবায়ে দীপ জীবননিশি-যাপনা ৷
অমন দীননয়নে আর চেয়ো না ৷ ৷
২৭ আষাঢ় ১৩০০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন