রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কোন ছায়াখানি
সঙ্গে তব ফেরে লয়ে স্বপ্নরুদ্ধ বাণী,
তুমি কি আপনি তাহা জানো?
চোখের দৃষ্টিতে তব রয়েছে বিছানো
আপনা-বিস্মৃত তারি
স্তম্ভিত-স্তিমিত অশ্রুবারি ৷ ৷
একদিন জীবনের প্রথম ফাল্গুনী
এসেছিল, তুমি তারি পদধ্বনি শুনি
কম্পিতকৌতুকী
যেমনি খুলিয়া দ্বার দিলে উঁকি,
আম্রমঞ্জরির গন্ধে মধুপগুঞ্জনে
হৃদয়স্পন্দনে
এক ছন্দে মিলে গেল বনের মর্মর ৷
অশোকের কিশলয়স্তর
উৎসুক যৌবনে তব বিস্তারিল নবীন রক্তিমা ৷
প্রাণোচ্ছ্বাস নাহি পায় সীমা
তোমার আপনা-মাঝে—
সে প্রাণেরই ছন্দ বাজে
দূর নীলবনান্তের বিহঙ্গসংগীতে,
দিগন্তে নির্জনলীন রাখালের করুণ বংশীতে ৷
তব বনচ্ছায়ে
আসিল অতিথি পান্থ, তৃণস্তরে দিল সে বিছায়ে
উত্তরী-অংশুকে তার সুবর্ণ পূর্ণিমা,
চম্পকবর্ণিমা ৷
তারি সঙ্গে মিশে
প্রভাতের মৃদু রৌদ্র দিশে দিশে
তোমার বিধুর হিয়া
দিল উচ্ছ্বসিয়া ৷ ৷
তার পর সসংকোচে বদ্ধ করি দিলে তব দ্বার;
উচ্ছৃঙ্খল সমীরণে উদ্দামকুন্তলভার
লইলে সংযত করি—
অশান্ত তরুণ প্রেম বসন্তের পন্থ অনুসরি
স্খলিতকিংশুক-সাথে
জীর্ণ হল ধূসর ধুলাতে ৷ ৷
তুমি ভাবো সেই রাত্রি দিন
চিহ্নহীন,
মল্লিকাগন্ধের মতো
নির্বিশেষে গত ৷
জান না কি যে বসন্ত সম্বরিল কায়া
তারি মৃত্যুহীন ছায়া
অহর্নিশি আছে তব সাথে সাথে
তোমার অজ্ঞাতে ৷
অদৃশ্য মঞ্জরি তার আপনার রেণুর রেখায়
মেশে তব সীমন্তের সিন্দূরলেখায়;
সুদূর সে ফাল্গুনের স্তব্ধ সুর
তোমার কণ্ঠের স্বর করি দিল উদাত্ত মধুর ৷
যে চাঞ্চল্য হয়ে গেছে স্থির
তারি মন্ত্রে চিত্ত তব সকরুণ শান্ত সুগম্ভীর ৷ ৷
জোড়াসাঁকো [:কলিকাতা:]
১ মাঘ ১৩৩৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন