রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মনে পড়ে যেন এক কালে লিখিতাম
চিঠিতে তোমারে ‘প্রেয়সী’ অথবা ‘প্রিয়ে’ ৷
এ কালের দিনে শুধু বুঝি লেখে নাম—
থাক সে কথায়, লিখি বিনা নাম দিয়ে ৷
তুমি দাবি কর কবিতা আমার কাছে
মিল মিলাইয়া দুরূহ ছন্দে লেখা,
আমার কাব্য তোমার দুয়ারে যাচে
নম্র চোখের কম্প্র কাজলরেখা ৷
সহজ ভাষায় কথাটা বলাই শ্রেয়—
যে-কোনো ছুতায় চলে এসো মোর ডাকে—
সময় ফুরোলে আবার ফিরিয়া যেয়ো,
বোসো মুখোমুখি যদি অবসর থাকে ৷
গৌরবরন তোমার চরণমূলে
ফলসাবরন শাড়িটি ঘেরিবে ভালো—
বসনপ্রান্ত সীমন্তে রেখো তুলে,
কপোলপ্রান্তে সরু পাড় ঘনকালো ৷
একগুছি চুল বায়ু-উচ্ছ্বাসে-কাঁপা
ললাটের ধারে থাকে যেন অশাসনে,
ডাহিন অলকে একটি দোলনচাঁপা
দুলিয়া উঠুক গ্রীবাভঙ্গির সনে ৷
বৈকালে-গাঁথা যূথীমুকুলের মালা
কণ্ঠের তাপে ফুটিয়া উঠিবে সাঁঝে,
দূরে থাকিতেই গোপনগন্ধ-ঢালা
সুখসংবাদ মেলিবে হৃদয়মাঝে ৷
এই সুযোগেতে একটুকু দিই খোঁটা—
আমারই দেওয়া সে ছোট্ট চুনির দুল
রক্তে-জমানো যেন অশ্রুর ফোঁটা,
কতদিন সেটা পরিতে করেছ ভুল ৷ ৷
আরেকটা কথা বলে রাখি এইখানে,
কাব্যে সে কথা হবে না মানানসই,
সুর দিয়ে সেটা গাহিব না কোনো গানে,
তুচ্ছ শোনাবে, তবু সে তুচ্ছ কই ৷
এ কালে চলে না সোনার প্রদীপ আনা,
সোনার বীণাও নহে আয়ত্তগত ৷
বেতের ডালায় রেশমি-রুমাল-টানা
অরুণবরন আম এনো গোটাকত ৷
গদ্যজাতীয় ভোজ্যও কিছু দিয়ো,
পদ্যে তাদের মিল খুঁজে পাওয়া দায় ৷
তা হোক, তবুও লেখকের তারা প্রিয়—
জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায় ৷
ওই দেখো, ওটা আধুনিকতার ভূত
মুখেতে জোগায় স্থুলতার জয়ভাষা—
জানি অমরার পথহারা কোনো দূত
জঠরগুহায় নাহি করে যাওয়া-আসা ৷
তথাপি পষ্ট বলিতে নাহি তো দোষ
যে কথা কবির গভীর মনের কথা—
উদরবিভাগে দৈহিক পরিতোষ
সঙ্গী জোটায় মানসিক মধুরতা ৷
শোভন হাতের সন্দেশ-পান্তোয়া
মাছ-মাংসের পোলাও ইত্যাদিও
যবে দেখা দেয় সেবামাধুর্যে-ছোঁওয়া
তখন সে হয় কী অনির্বচনীয় ৷
বুঝি অনুমানে চোখে কৌতুক ঝলে,
ভাবিছ বসিয়া সহাস-ওষ্ঠাধরা—
এ-সমস্তই কবিতার কৌশলে
মৃদুসংকেতে মোটা ফর্মাশ করা ৷
আচ্ছা, নাহয় ইঙ্গিত শুনে হেসো,
বরদানে, দেবী, নাহয় হইবে বাম—
খালি হাতে যদি আস তবে তাই এসো,
সে দুটি হাতেরও কিছু কম নহে দাম ৷ ৷
সেই কথা ভালো, তুমি চলে এসো একা,
বাতাসে তোমার আভাস যেন গো থাকে—
স্তব্ধ প্রহরে দুজনে বিজনে দেখা,
সন্ধ্যাতারাটি শিরীষ-ডালের ফাঁকে ৷
তার পরে যদি ফিরে যাও ধীরে ধীরে
ভুলে ফেলে যেয়ো তোমার যূথীর মালা—
ইমন বাজিবে বক্ষের শিরে শিরে,
তার পরে হবে কাব্য লেখার পালা ৷
যত লিখে যাই ততই ভাবনা আসে,
লেফাফার ’পরে কার নাম দিতে হবে!
মনে মনে ভাবি গভীর দীর্ঘশ্বাসে
কোন দূর যুগে তারিখ ইহার কবে ৷ ৷
মনে ছবি আসে— ঝিকিমিকি বেলা হল,
বাগানের ঘাটে গা ধুয়েছ তাড়াতাড়ি—
কচি মুখখানি, বয়স তখন ষোলো,
তনু দেহখানি ঘেরিয়াছে ডুরে শাড়ি ৷
কুঙ্কুমফোঁটা ভুরুসঙ্গমে কিবা,
শ্বেতকরবীর গুচ্ছ কর্ণমূলে—
পিছন হইতে দেখিনু কোমল গ্রীবা
লোভন হয়েছে রেশমচিকন চুলে ৷
তাম্রথালায় গোড়েমালাখানি গেঁথে
সিক্ত রুমালে যত্নে রেখেছ ঢাকি,
ছায়া-হেলা ছাদে মাদুর দিয়েছ পেতে—
কার কথা ভেবে বসে আছ জানি না কি?
আজি এই চিঠি লিখিছে তো সেই কবি—
গোধূলির ছায়া ঘনায় বিজন ঘরে,
দেয়ালে ঝুলিছে সেদিনের ছায়াছবি—
শব্দটি নেই, ঘড়ি টিকটিক করে ৷
ওই তো তোমার হিসাবের ছেঁড়া পাতা,
দেরাজের কোণে পড়ে আছে আধুলিটি ৷
কতদিন হল গিয়েছ ভাবিব না তা,
শুধু রচি বসে নিমন্ত্রণের চিঠি ৷
মনে আসে, তুমি পুব জানালার ধারে
পশমের গুটি কোলে নিয়ে আছ বসে—
উৎসুক চোখে বুঝি আশা কর কারে,
আলগা আঁচল মাটিতে পড়েছে খসে ৷
অর্ধেক ছাদে রৌদ্র নেমেছে বেঁকে,
বাকি অর্ধেক ছায়াখানি দিয়ে ছাওয়া,
পাঁচিলের গায়ে চীনের টবের থেকে
চামেলি ফুলের গন্ধ আনিছে হাওয়া ৷ ৷
এ চিঠির নেই জবাব দেবার দায়,
আপাতত এটা দেরাজে দিলেম রেখে ৷
পারো যদি এসো শব্দবিহীন পায়,
চোখ টিপে ধোরো হঠাৎ পিছন থেকে ৷
আকাশে চুলের গন্ধটি দিয়ো পাতি,
এনো সচকিত কাঁকনের রিনিরিন ৷
আনিয়ো মধুর স্বপ্নসঘন রাতি,
আনিয়ো গভীর আলস্যঘন দিন ৷
তোমাতে আমাতে মিলিত নিবিড় একা—
স্থির আনন্দ, মৌনমাধুরীধারা,
মুগ্ধ প্রহর ভরিয়া তোমারে দেখা,
তব করতল মোর করতলে হারা ৷ ৷
চন্দননগর
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৪২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন