রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা ৷
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক’রে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা ৷
আয় দুরন্ত, আয় রে আমার কাঁচা ৷ ৷
খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায়;
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে, ওদের ঘরের দাওয়ায় ৷
ওই-যে প্রবীণ, ওই-যে পরম পাকা—
চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা,
ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ-করা খাঁচায় ৷
আয় জীবন্ত, আয় রে আমার কাঁচা ৷ ৷
বাহির-পানে তাকায় না যে কেউ,
দেখে না যে বান ডেকেছে—
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ ৷
চলতে ওরা চায় না মাটির ছেলে
মাটির ’পরে চরণ ফেলে ফেলে,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাচায় ৷
আয় অশান্ত, আয় রে আমার কাঁচা ৷ ৷
তোরে হেথায় করবে সবাই মানা ৷
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে, একি বিষম কাণ্ডখানা!
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে,
শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে,
সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে
লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায় ৷
আয় প্রচণ্ড, আয় রে আমার কাঁচা ৷ ৷
শিকল-দেবীর ওই-যে পূজাবেদি
চিরকাল কি রইবে খাড়া?
পাগলামি, তুই আয় রে দুয়ার ভেদি ৷
ঝড়ের মাতন বিজয়-কেতন নেড়ে
অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে
ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আন রে বাছা-বাছা ৷
আয় প্রমত্ত, আয় রে আমার কাঁচা ৷ ৷
আন রে টেনে বাঁধা পথের শেষে ৷
বিবাগি কর অবাধ-পানে,
পথ কেটে যাই অজানাদের দেশে ৷
আপদ আছে, জানি আঘাত আছে,
তাই জেনে তো বক্ষে পরান নাচে—
ঘুচিয়ে দে, ভাই, পুঁথিপোড়োর কাছে
পথে চলার বিধিবিধান যাচা ৷
আয় প্রমুক্ত, আয় রে আমার কাঁচা ৷ ৷
চিরযুবা তুই যে চিরজীবী,
জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে
প্রাণ অফুরান ছড়িয়ে দেদার দিবি ৷
সবুজ নেশায় ভোর করেছিস ধরা,
ঝড়ের মেঘে তোরই তড়িৎ ভরা,
বসন্তেরে পরাস আকুল-করা
আপন গলার বকুল-মাল্যগাছা ৷
আয় রে অমর, আয় রে আমার কাঁচা ৷ ৷
শান্তিনিকেতন
১৫ বৈশাখ ১৩২১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন