রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইঁটের-টোপর-মাথায়-পরা শহর কলিকাতা
অটল হয়ে বসে আছে— ইঁটের আসন পাতা ৷
ফাল্গুনে বয় বসন্তবায়, না দেয় তারে নাড়া ৷
বৈশাখেতে ঝড়ের দিনে ভিত রহে তার খাড়া ৷
শীতের হাওয়ায় থামগুলোতে একটু না দেয় কাঁপন ৷
শীত বসন্ত সমান-ভাবে করে ঋতু-যাপন ৷ ৷
অনেক দিনের কথা হল স্বপ্নে দেখেছিনু
হঠাৎ যেন চেঁচিয়ে উঠে বললে আমায় বিনু
‘চেয়ে দেখো’; ছুটে দেখি চৌকিখানা ছেড়ে—
কোলকাতাটা চলে বেড়ায় হঁ×টের শরীর নেড়ে ৷
উঁচু ছাদে নিচু ছাদে পাঁচিল-দেওয়া ছাদে
আকাশ যেন সওয়ার হয়ে চড়েছে তার কাঁধে ৷
রাস্তা গলি যাচ্ছে চলি অজগরের দল,
ট্র্যামগাড়ি তার পিঠে চেপে করছে টলোমল!
দোকান বাজার ওঠে নামে যেন ঝড়ের তরী,
চউরঙ্গীর মাঠখানা ওই যাচ্ছে সরি সরি ৷
মনুমেন্টে লেগেছে দোল, উলটিয়ে বা ফেলে—
খ্যাপা হাতির শুঁড়ের মতো ডাইনে বাঁয়ে হেলে ৷
ইস্কুলেতে ছেলেরা সব করতেছে হৈ-হৈ,
অঙ্কের বই নৃত্য করে ব্যাকরণের বই ৷
মেঝের ’পরে গড়িয়ে বেড়ায় ইংরেজি বইখানা,
ম্যাপগুলো সব পাখির মতো ঝাপট মারে ডানা ৷
ঘণ্টাখানা দুলে দুলে ঢঙঢঙাঢঙ বাজে—
দিন চলে যায়, কিছুতে সে থামতে পারে না যে ৷
রান্নাঘরে কেঁদে বলে রান্নাঘরের ঝি—
‘লাউ কুমড়ো দৌড়ে বেড়ায় ; আমি করব কী!’
হাজার হাজার মানুষ চেঁচায়, ‘আরে, থামো থামো—
কোথা থেকে কোথায় যাবে কেমন এ পাগলামো!’
‘আরে আরে, চলল কোথায়’ হাওড়ার ব্রিজ বলে—
‘একটুকু আর নড়লে আমি পড়ব খসে জলে ৷’
বড়োবাজার মেছোবাজার চিনেবাজার থেকে—
‘স্থির হয়ে রও’ ‘স্থির হয়ে রও’ বলে সবাই হেঁকে ৷
আমি ভাবছি যাক-না কেন, ভাবনা কিছুই নাই—
কোলকাতা নয় দিল্লি যাবে কিম্বা সে বোম্বাই ৷ ৷
হঠাৎ কিসের আওয়াজ হল, তন্দ্রা ভেঙে যায়—
তাকিয়ে দেখি কোলকাতা সেই আছে কোলকাতায় ৷ ৷
[:শান্তিনিকেতন:]
৬ পৌষ ১৩৩৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন