রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বহিছে হাওয়া উতল বেগে,
আকাশ ঢাকা সজল মেঘে,
ধ্বনিয়া উঠে কেকা ৷
করি নি কাজ, পরি নি বেশ,
গিয়েছে বেলা, বাঁধি নি কেশ—
পড়ি তোমারই লেখা ৷
ওগো আমারই কবি,
তোমারে আমি জানি নে কভু,
তোমার বাণী আঁকিছে তবু
অলস মনে অজানা তব ছবি ৷
বাদল-ছায়া হায় গো মরি
বেদনা দিয়ে তুলেছ ভরি,
নয়ন মম করিছে ছলোছলো ৷
হিয়ার মাঝে কী কথা তুমি বলো ৷ ৷
কোথায় কবে আছিলে জাগি,
বিরহ তব কাহার লাগি—
কোন সে তব প্রিয়া ৷
ইন্দ্র তুমি, তোমার শচী—
জানি তাহারে তুলেছ রচি
আপন মায়া দিয়া ৷
ওগো আমার কবি,
ছন্দ বুকে যতই বাজে
ততই সেই মুরতি-মাঝে
জানি না কেন আমারে আমি লভি ৷
নারীহৃদয়-যমুনাতীরে
চিরদিনের সোহাগিনীরে
চিরকালের শুনাও স্তবগান—
বিনা কারণে দুলিয়া ওঠে প্রাণ ৷ ৷
নাই বা তার শুনিনু নাম,
কভু তাহারে না দেখিলাম
কিসের ক্ষতি তায় ৷
প্রিয়ারে তব যে নাহি জানে
জানে সে তারে তোমার গানে
আপন চেতনায় ৷
ওগো আমার কবি,
সুদূর তব ফাগুন-রাতি
রক্তে মোর উঠিল মাতি—
চিত্তে মোর উঠিছে পল্লবি ৷
জেনেছ যারে তাহারও মাঝে
অজানা যেই সেই বিরাজে,
আমি যে সেই অজানাদের দলে,
তোমার মালা এল আমার গলে ৷ ৷
বৃষ্টি-ভেজা যে ফুলহার
শ্রাবণসাঁঝে তব প্রিয়ার
বেণীটি ছিল ঘেরি,
গন্ধ তারই স্বপ্নসম
লাগিছে মনে, যেন সে মম
বিগত জনমেরই ৷
ওগো আমার কবি,
জান না তুমি মৃদু কী তানে
আমারই এই লতাবিতানে
শুনায়েছিলে করুণ ভৈরবী ৷
ঘটে নি যাহা আজ কপালে
ঘটেছে যেন সে কোন কালে—
আপন-ভোলা যেন তোমার গীতি
বহিছে তারই গভীর বিস্মৃতি ৷ ৷
শান্তিনিকেতন
বৈশাখ ১৩৪১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন