রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওগো, কে তুমি বসিয়া উদাসমুরতি
বিষাদশান্ত শোভাতে!
ওই ভৈরবী আর গেয়ো নাকো এই প্রভাতে—
মোর গৃহছাড়া এই পথিকপরান
তরুণ হৃদয় লোভাতে ৷ ৷
ওই মন-উদাসীন ওই আশাহীন
ওই ভাষাহীন কাকলি
দেয় ব্যাকুল পরশে সকল জীবন বিকলি ৷
দেয় চরণে বাঁধিয়া প্রেমবাহু-ঘেরা
অশ্রুকোমল শিকলি ৷
হায় মিছে মনে হয় জীবনের ব্রত,
মিছে মনে হয় সকলই ৷ ৷
যারে ফেলিয়া এসেছি, মনে করি, তারে
ফিরে দেখে আসি শেষবার—
ওই কাঁদিছে সে যেন এলায়ে আকুল কেশভার ৷
যারা গৃহছায়ে বসি সজলনয়ন
মুখ মনে পড়ে সে-সবার ৷ ৷
এই সংকটময় কর্মজীবন
মনে হয় মরু সাহারা,
দূরে মায়াময় পুরে দিতেছে দৈত্য পাহারা ৷
তবে ফিরে যাওয়া ভালো তাহাদের পাশে
পথ চেয়ে আছে যাহারা ৷ ৷
সেই ছায়াতে বসিয়া সারা দিনমান,
তরুমর্মর পবনে,
সেই মুকুল-আকুল বকুলকুঞ্জভবনে,
সেই কুহুকুহরিত বিরহরোদন
থেকে থেকে পশে শ্রবণে ৷ ৷
সেই চিরকলতান উদার গঙ্গা
বহিছে আঁধারে আলোকে,
সেই তীরে চিরদিন খেলিছে বালিকা-বালকে
ধীরে সারা দেহ যেন মুদিয়া আসিছে
স্বপ্নপাখির পালকে ৷ ৷
হায়, অতৃপ্ত যত মহৎবাসনা
গোপনমর্মদাহিনী,
এই আপনা-মাঝারে শুষ্ক জীবনবাহিনী ৷
ওই ভৈরবী দিয়া গাঁথিয়া গাঁথিয়া
রচিব নিরাশাকাহিনী ৷ ৷
সদা করুণ কণ্ঠ কাঁদিয়া গাহিবে,
‘হল না, কিছুই হবে না ৷
এই মায়াময় ভবে চিরদিন কিছু রবে না ৷
কেহ জীবনের যত গুরুভার ব্রত
ধূলি হতে তুলি লবে না ৷ ৷
‘যদি কাজ নিতে হয় কত কাজ আছে,
একা কি পারিব করিতে!
কাঁদে শিশিরবিন্দু জগতের তৃষা হরিতে!
কেন অকূল সাগরে জীবন সঁপিব
একেলা জীর্ণ তরীতে ৷ ৷
‘শেষে দেখিব পড়িল সুখযৌবন
ফুলের মতন খসিয়া—
হায় বসন্তবায়ু মিছে চলে গেল শ্বসিয়া,
সেই যেখানে জগৎ ছিল এক কালে
সেইখানে আছে বসিয়া ৷ ৷
‘শুধু আমারি জীবন মরিল ঝুরিয়া
চিরজীবনের তিয়াষে ৷
এই দগ্ধ হৃদয় এতদিন আছে কী আশে!
সেই ডাগর নয়ন, সরস অধর
গেল চলি কোথা দিয়া সে!’
ওগো, থামো, যারে তুমি বিদায় দিয়েছ
তারে আর ফিরে চেয়ো না ৷
ওই অশ্রুসজল ভৈরবী আর গেয়ো না ৷
আজি প্রথম প্রভাতে চলিবার পথ
নয়নবাষ্পে ছেয়ো না ৷ ৷
ওই কুহকরাগিণী এখনি কেন গো
পথিকের প্রাণ বিবশে!
পথে এখনো উঠিবে প্রখর তপন দিবসে,
পথে রাক্ষসী সেই তিমিররজনী
না জানি কোথায় নিবসে ৷ ৷
থামো, শুধু একবার ডাকি নাম তাঁর
নবীন জীবন ভরিয়া,
যাব যাঁর বল পেয়ে সংসারপথ তরিয়া
যত মানবের গুরু মহৎজনের
চরণচিহ্ন ধরিয়া ৷ ৷
যাও তাহাদের কাছে ঘরে যারা আছে
পাষাণে পরান বাঁধিয়া,
গাও তাদের জীবনে তাদের বেদনে কাঁদিয়া ৷
তারা প’ড়ে ভূমিতলে ভাসে আঁখিজলে
নিজ সাধে বাদ সাধিয়া ৷ ৷
হায়, উঠিতে চাহিছে পরান, তবুও
পারে না তাহারা উঠিতে ৷
তারা পারে না ললিত লতার বাঁধন টুটিতে ৷
তারা পথ জানিয়াছে, দিবানিশি তবু
পথপাশে রহে লুটিতে ৷ ৷
তারা অলস বেদন করিবে যাপন
অলস রাগিণী গাহিয়া,
রবে দূর আলো-পানে আবিষ্টপ্রাণে চাহিয়া ৷
ওই মধুর রোদনে ভেসে যাবে তারা
দিবসরজনী বাহিয়া ৷ ৷
সেই আপনার গানে আপনি গলিয়া
আপনারে তারা ভুলাবে,
স্নেহে আপনার দেহে সকরুণ কর বুলাবে ৷
সুখে কোমল শয়নে রাখিয়া জীবন
ঘুমের দোলায় দুলাবে ৷ ৷
ওগো, এর চেয়ে ভালো প্রখর দহন,
নিঠুর আঘাত চরণে ৷
যাব আজীবনকাল পাষাণকঠিন
সরণে ৷
যদি মৃত্যুর মাঝে নিয়ে যায় পথ
সুখ আছে সেই মরণে ৷ ৷
২৯ জ্যৈষ্ঠ ১২৯৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন