রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওগো বর, ওগো বঁধু,
এই-যে নবীনা বুদ্ধিবিহীনা এ তব বালিকা বধূ ৷
তোমার উদার প্রাসাদে একেলা
কত খেলা নিয়ে কাটায় যে বেলা—
তুমি কাছে এলে ভাবে তুমি তার খেলিবার ধন শুধু,
ওগো বর, ওগো বঁধু ৷ ৷
জানে না করিতে সাজ ৷
কেশবেশ তার হলে একাকার মনে নাহি মানে লাজ ৷
দিনে শতবার ভাঙিয়া গড়িয়া
ধুলা দিয়া ঘর রচনা করিয়া
ভাবে মনে মনে সাধিছে আপন ঘরকরনের কাজ ৷
জানে না করিতে সাজ ৷ ৷
কহে এরে গুরুজনে
‘ও যে তোর পতি’ ‘ও তোর দেবতা’— ভীত হয়ে তাহা শোনে ৷
কেমন করিয়া পূজিবে তোমায়
কোনোমতে তাহা ভাবিয়া না পায়—
খেলা ফেলি কভু মনে পড়ে তার, ‘পালিব পরানপণে
যাহা কহে গুরুজনে ৷’
বাসকশয়ন-’পরে
তোমার বাহুতে বাঁধা রহিলেও অচেতন ঘুমভরে ৷
সাড়া নাহি দেয় তোমার কথায়,
কত শুভখন বৃথা চলি যায়—
যে হার তাহারে পরালে সে হার কোথায় খসিয়া পড়ে
বাসকশয়ন-’পরে ৷ ৷
শুধু দুর্দিনে ঝড়ে—
দশ দিক ত্রাসে আঁধারিয়া আসে ধরাতলে অম্বরে,
তখন নয়নে ঘুম নাই আর,
খেলাধুলা কোথা পড়ে থাকে তার—
তোমারে সবলে রহে আঁকড়িয়া, হিয়া কাঁপে থরথরে—
দুঃখদিনের ঝড়ে ৷ ৷
মোরা মনে করি ভয়
তোমার চরণে অবোধজনের অপরাধ পাছে হয় ৷
তুমি আপনার মনে মনে হাস,
এই দেখিতেই বুঝি ভালোবাস—
খেলাঘর-দ্বারে দাঁড়াইয়া আড়ে কী যে পাও পরিচয়!
মোরা মিছে করি ভয় ৷ ৷
তুমি বুঝিয়াছ মনে
একদিন এর খেলা ঘুচে যাবে ওই তব শ্রীচরণে ৷
সাজিয়া যতনে তোমারি লাগিয়া
বাতায়নতলে রহিবে জাগিয়া—
শতযুগ করি মানিবে তখন ক্ষণেক অদর্শনে
তুমি বুঝিয়াছ মনে ৷ ৷
ওগো বর, ওগো বঁধু,
জানো জানো তুমি ধুলায় বসিয়া এ বালা তোমারি বধূ ৷
রতন-আসন তুমি এরই তরে
রেখেছ সাজায়ে নির্জন ঘরে—
সোনার পাত্রে ভরিয়া রেখেছ নন্দনবনমধু,
ওগো বর, ওগো বঁধু ৷ ৷
১৫ শ্রাবণ ১৩১২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন