রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অলস সময়ধারা বেয়ে
মন চলে শূন্য-পানে চেয়ে ৷
সে মহাশূন্যের পথে ছায়া-আঁকা ছবি পড়ে চোখে ৷
কত কাল দলে দলে গেছে কত লোকে
সুদীর্ঘ অতীতে
জয়োদ্ধত প্রবল গতিতে ৷
এসেছে সাম্রাজ্যলোভী পাঠানের দল,
এসেছে মোগল;
বিজয়রথের চাকা
উড়ায়েছে ধূলিজাল, উড়িয়াছে বিজয়পতাকা ৷
শূন্যপথে চাই,
আজ তার কোনো চিহ্ন নাই ৷
নির্মল সে নীলিমায় প্রভাতে ও সন্ধ্যায় রাঙালো
যুগে যুগে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের আলো ৷
আরবার সেই শূন্যতলে
আসিয়াছে দলে দলে
লৌহবাঁধা পথে
অনলনিশ্বাসী রথে
প্রবল ইংরেজ;
বিকীর্ণ করেছে তার তেজ ৷
জানি তারো পথ দিয়ে বয়ে যাবে কাল,
কোথায় ভাসায়ে দেবে সাম্রাজ্যের দেশ-বেড়া জাল ৷
জানি তার পণ্যবাহী সেনা
জ্যোতিষ্কলোকের পথে রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না ৷ ৷
মাটির পৃথিবী-পানে আঁখি মেলি যবে
দেখি সেথা কলকলরবে
বিপুল জনতা চলে
নানা পথে নানা দলে দলে
যুগ যুগান্তর হতে মানুষের নিত্য-প্রয়োজনে
জীবনে মরণে ৷
ওরা চিরকাল
টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল;
ওরা মাঠে মাঠে
বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে—
ওরা কাজ করে
নগরে প্রান্তরে ৷
রাজছত্র ভেঙে পড়ে; রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে;
জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে;
রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি ৷
ওরা কাজ করে
দেশে দেশান্তরে,
অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের সমুদ্র-নদীর ঘাটে ঘাটে,
পঞ্জাবে বোম্বাই-গুজরাটে ৷
গুরু গুরু গর্জন— গুন গুন স্বর—
দিনরাত্রে গাঁথা পড়ি দিনযাত্রা করিছে মুখর ৷
দুঃখ সুখ দিবসরজনী
মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি ৷
শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ-’পরে
ওরা কাজ করে ৷ ৷
শান্তিনিকেতন
১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১
[:১ ফাল্গুন ’৪৭:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন