রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ডেকেছ আজি, এসেছি সাজি, হে মোর লীলাগুরু—
শীতের রাতে তোমার সাথে কী খেলা হবে শুরু!
ভাবিয়াছিনু গীতবিহীন
গোধূলিছায়ে হল বিলীন
পরান মম, হিমে-মলিন আড়াল তারে ঘেরি—
এমন ক্ষণে কেন গগনে বাজিল তব ভেরি? ৷
উতরবায় কারে জাগায়, কে বুঝে তার বাণী—
অন্ধকারে কুঞ্জদ্বারে বেড়ায় কর হানি ৷
কাঁদিয়া কয় কাননভূমি,
‘কী আছে মোর, কী চাহ তুমি?
শুষ্ক শাখা যাও যে চুমি, কাঁপাও থরথর—
জীর্ণ পাতা বিদায়গাথা গাহিছে মরমর ৷’
বুঝেছি তব এ অভিনব ছলনাভরা খেলা,
তুলিছ ধ্বনি কী আগমনী আজি যাবার বেলা?
যৌবনেরে তুষারডোরে
রাখিয়াছিলে অসাড় ক’রে,
বাহির হতে বাঁধিলে ওরে কুয়াশাঘন জালে—
ভিতরে ওর ভাঙালে ঘোর নাচের তালে তালে ৷ ৷
নৃত্যলীলা জড়ের শিলা করুক খান-খান,
মৃত্যু হতে অবাধ স্রোতে বহিয়া যাক প্রাণ ৷
নৃত্য তব ছন্দে তারি
নিত্য ঢালে অমৃতবারি,
শঙ্খ কহে হুহুংকারি বাঁধন সে তো মায়া—
যা-কিছু ভয়, যা-কিছু ক্ষয়, সে তো ছায়ার ছায়া ৷ ৷
এসেছে শীত গাহিতে গীত বসন্তেরই জয়—
যুগের পরে যুগান্তরে মরণ করে লয় ৷
তাণ্ডবের ঘূর্ণিঝড়ে
শীর্ণ যাহা ঝরিয়া পড়ে,
প্রাণের জয়তোরণ গড়ে আনন্দের তানে—
বসন্তের যাত্রা চলে অনন্তের পানে ৷ ৷
বাঁধনে যারে বাঁধিতে নারে বন্দী করি তারে
তোমার হাসি সমুচ্ছ্বাসি উঠিছে বারে বারে ৷
অমর আলো হারাবে না যে,
পালিছ তারে আঁধার-মাঝে—
নিশীথনাচে ডমরু-বাজে, অরুণদ্বার খোলে—
জাগে মুরতি, পুরানো জ্যোতি নব উষার কোলে ৷ ৷
জাগুক মন, কাঁপুক বন, উড়ুক ঝরা পাতা—
উঠুক জয়, তোমারি জয়, তোমারি জয়গাথা ৷
ঋতুর দল নাচিয়া চলে
ভরিয়া ডালি ফুলে ও ফলে,
নৃত্যলোল চরণতলে মুক্তি পায় ধরা—
ছন্দে মেতে যৌবনেতে রাঙিয়ে ওঠে জরা ৷ ৷
১৩ অগ্রহায়ণ ১৩৩৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন