রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উজ্জ্বল শ্যামল বর্ণ, গলায় গলার হারখানি ৷
চেয়েছি অবাক মানি
তার পানে ৷
বড়ো বড়ো কাজল নয়ানে
অসংকোচে ছিল চেয়ে
নবকৈশোরের মেয়ে;
ছিল তারি কাছাকাছি বয়স আমার ৷
স্পষ্ট মনে পড়ে ছবি ৷ ঘরের দক্ষিণে খোলা দ্বার,
সকালবেলার রোদে বাদাম গাছের মাথা
ফিকে আকাশের নীলে মেলেছে চিকন ঘন পাতা ৷
একখানি সাদা শাড়ি কাঁচা কচি গায়ে,
কালো পাড় দেহ ঘিরে ঘুরিয়া পড়েছে তার পায়ে;
দুখানি সোনার চুড়ি নিটোল দু হাতে—
ছুটির মধ্যাহ্নে পড়া কাহিনীর পাতে
ওই মূর্তিখানি ছিল ৷ ডেকেছে সে মোরে মাঝে মাঝে
বিধির খেয়াল যেথা নানাবিধ সাজে
রচে মরীচিকালোক নাগালের পারে
বালকের স্বপ্নের কিনারে ৷
দেহ ধরি মায়া
আমার শরীরে মনে ফেলিল অদৃশ্য ছায়া
সূক্ষ্মস্পর্শময়ী ৷
সাহস হল না কথা কই ৷
হৃদয় ব্যথিল মোর অতিমৃদুগুঞ্জরিত সুরে—
ও যে দূরে, ও যে বহুদূরে!
যত দূরে শিরীষের ঊর্ধ্বশাখা, যেথা হতে ধীরে
ক্ষীণ গন্ধ নেমে আসে প্রাণের গভীরে ৷
একদিন পুতুলের বিয়ে,
পত্র গেল দিয়ে ৷
কলরব করেছিল হেসে খেলে
নিমন্ত্রিত-দল ৷ আমি মুখচোরা ছেলে
এক পাশে সংকোচে পীড়িত ৷ সন্ধ্যা গেল বৃথা ৷
পরিবেশনের ভাগে পেয়েছিনু মনে নেই কী তা ৷
দেখেছিনু দ্রুতগতি দুখানি পা আসে যায় ফিরে,
কালো পাড় নাচে তারে ঘিরে ৷
কটাক্ষে দেখেছি তার কাঁকনে নিরেট রোদ
দু হাতে পড়েছে যেন বাঁধা ৷ অনুরোধ উপরোধ
শুনেছিনু তার স্নিগ্ধ স্বরে ৷
ফিরে এসে ঘরে
মনে বেজেছিল তারি প্রতিধ্বনি
অর্ধেক রজনী ৷ ৷
তার পরে একদিন
জানাশোনা হল বাধাহীন ৷
একদিন নিয়ে তার ডাকনাম
তারে ডাকিলাম ৷
একদিন ঘুচে গেল ভয়,
পরিহাসে পরিহাসে হল দোঁহে কথা-বিনিময় ৷
কখনো বা গ’ড়ে-তোলা দোষ
ঘটায়েছে ছল-করা রোষ ৷
কখনো বা শ্লেষবাক্যে নিষ্ঠুর কৌতুক
হেনেছিল দুখ ৷
কখনো বা দিয়েছিল অপবাদ—
অনবধানের অপরাধ ৷
কখনো দেখেছি তার অযত্নের সাজ—
রন্ধনে ছিল সে ব্যস্ত, পায় নাই লাজ ৷
পুরুষসুলভ মোর কত মূঢ়তারে
ধিক্কার দিয়েছে নিজ স্ত্রীবুদ্ধির তীব্র অহংকারে ৷
একদিন বলেছিল ‘জানি হাত দেখা’;
হাতে তুলে নিয়ে হাত নতশিরে গণেছিল রেখা;
বলেছিল ‘তোমার স্বভাব
প্রেমের লক্ষণে দীন’ ৷— দিই নাই কোনোই জবাব ৷
পরশের সত্য পুরস্কার
খণ্ডিয়া দিয়েছে দোষ মিথ্যা সে নিন্দার ৷ ৷
তবু ঘুচিল না
অসম্পূর্ণ চেনার বেদনা ৷
সুন্দরের দূরত্বের কখনো হয় না ক্ষয়,
কাছে পেয়ে না-পাওয়ার দেয় অফুরন্ত পরিচয় ৷ ৷
পুলকে-বিষাদে-মেশা দিন পরে দিন
পশ্চিমে দিগন্তে হয় লীন ৷
চৈত্রের আকাশতলে নীলিমার লাবণ্য ঘনালো,
আশ্বিনের আলো
বাজালো সোনার ধানে ছুটির সানাই ৷
চলেছে মন্থর তরী নিরুদ্দেশে স্বপ্নেতে বোঝাই ৷ ৷
৩১ অক্টোবর ১৯৩৮ [:১৪ কার্তিক ’৪৫:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন