রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে ৷
আমি চোখ মেললুম আকাশে—
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে ৷
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’—
সুন্দর হল সে ৷
তুমি বলবে এ যে তত্বকথা, এ কবির বাণী নয় ৷
আমি বলব এ সত্য,
তাই এ কাব্য ৷
এ আমার অহংকার,
অহংকার সমস্ত মানুষের হয়ে ৷
মানুষের অহংকারপটেই
বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প ৷
তত্বজ্ঞানী জপ করছেন নিশ্বাসে প্রশ্বাসে—
না, না, না—
না পান্না, না চুনি, না আলো, না গোলাপ,
না আমি, না তুমি ৷
ও দিকে, অসীম যিনি তিনি স্বয়ং করেছেন সাধনা
মানুষের সীমানায়,
তাকেই বলে ‘আমি’ ৷
সেই আমি’র গহনে আলো-আঁধারের ঘটল সংগম,
দেখা দিল রূপ, জেগে উঠল রস;
‘না’ কখন ফুটে উঠে হল ‘হাঁ’, মায়ার মন্ত্রে,
রেখায় রঙে, সুখে দুঃখে ৷ ৷
একে বোলো না তত্ব—
আমার মন হয়েছে পুলকিত
বিশ্ব-আমি’র রচনার আসরে
হাতে নিয়ে তুলি, পাত্রে নিয়ে রঙ ৷ ৷
পণ্ডিত বলছেন—
বুড়ো চন্দ্রটা, নিষ্ঠুর চতুর হাসি তার,
মৃত্যুদূতের মতো গুঁড়ি মেরে আসছে সে
পৃথিবীর পাঁজরের কাছে ৷
একদিন দেবে চরম টান তার সাগরে পর্বতে;
মর্তলোকে মহাকালের নূতন খাতায়
পাতা জুড়ে নামবে একটা শূন্য,
গিলে ফেলবে দিনরাতের জমাখরচ;
মানুষের কীর্তি হারাবে অমরতার ভান,
তার ইতিহাসে লেপে দেবে
অনন্ত রাত্রির কালি ৷
মানুষের যাবার দিনের চোখ
বিশ্ব থেকে নিকিয়ে নেবে রঙ,
মানুষের যাবার দিনের মন
ছানিয়ে নেবে রস ৷
শক্তির কম্পন চলবে আকাশে আকাশে,
জ্বলবে না কোথাও আলো ৷
বীণাহীন সভায় যন্ত্রীর আঙুল নাচবে,
বাজবে না সুর ৷
সেদিন কবিত্বহীন বিধাতা একা রবেন বসে
নীলিমাহীন আকাশে
ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গণিততত্ব নিয়ে ৷
তখন বিরাট বিশ্বভুবনে
দূরে দূরান্তে অনন্ত অসংখ্য লোকে লোকান্তরে
এ বাণী ধ্বনিত হবে না কোনোখানেই—
‘তুমি সুন্দর’,
‘আমি ভালোবাসি’ ৷
বিধাতা কি আবার বসবেন সাধনা করতে
যুগযুগান্তর ধ’রে—
প্রলয়সন্ধ্যায় জপ করবেন
‘কথা কও, কথা কও’,
বলবেন ‘বলো, তুমি সুন্দর’,
বলবেন ‘বলো, আমি ভালোবাসি’? ৷
শান্তিনিকেতন
১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন