রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মনে হচ্ছে শূন্য বাড়িটা অপ্রসন্ন,
অপরাধ হয়েছে আমার,
তাই আছে মুখ ফিরিয়ে ৷
ঘরে ঘরে বেড়াই ঘুরে,
আমার জায়গা নেই—
হাঁপিয়ে বেরিয়ে চলে আসি ৷
এ বাড়ি ভাড়া দিয়ে চলে যাব দেরাদুনে ৷ ৷
অমলির ঘরে ঢুকতে পারি নি বহুদিন,
মোচড় যেন দিত বুকে ৷
ভাড়াটে আসবে, ঘর দিতেই হবে সাফ করে—
তাই খুললেম ঘরের তালা ৷
একজোড়া আগ্রার জুতো,
চুল বাঁধবার চিরুনি, তেল, এসেন্সের শিশি ৷
শেলফে তার পড়বার বই,
ছোটো হার্মোনিয়ম ৷
একটা অ্যালবাম—
ছবি কেটে কেটে জুড়েছে তার পাতায় ৷
আলনায় তোয়ালে, জামা,
খদ্দরের শাড়ি ৷
ছোটো কাচের আলমারিতে
নানা রকমের পুতুল,
শিশি, খালি পাউডারের কৌটো ৷ ৷
চুপ করে বসে রইলেম চৌকিতে, টেবিলের সামনে ৷
লাল চামড়ার বাক্স,
ইস্কুলে নিয়ে যেত সঙ্গে—
তার থেকে খাতাটি নিলেম তুলে,
আঁক কষবার খাতা ৷
ভিতর থেকে পড়ল একটি আখোলা চিঠি,
আমারই ঠিকানা লেখা
অমলির কাঁচা হাতের অক্ষরে ৷ ৷
শুনেছি ড়ুবে মরবার সময়
অতীত কালের সব ছবি
এক মুহূর্তে দেখা দেয় নিবিড় হয়ে—
চিঠিখানি হাতে নিয়ে তেমনি পড়ল মনে
অনেক কথা এক নিমিষে ৷ ৷
অমলার মা যখন গেলেন মারা
তখন ওর বয়স ছিল সাত বছর ৷
কেমন একটা ভয় লাগল মনে
ও বুঝি বাঁচবে না বেশিদিন ৷
কেননা, বড়ো করুণ ছিল ওর মুখ,
যেন অকালবিচ্ছেদের ছায়া
ভাবী কাল থেকে উলটে এসে পড়েছিল
ওর বড়ো বড়ো কালো চোখের উপরে ৷
সাহস হত না ওকে সঙ্গছাড়া করি ৷
কাজ করছি আপিসে বসে,
হঠাৎ হত মনে
যদি কোনো আপদ ঘটে থাকে ৷ ৷
বাঁকিপুর থেকে মাসি এল ছুটিতে—
বললে, ‘মেয়েটার পড়াশুনো হল মাটি—
মূর্খু মেয়ের বোঝা বইবে কে
আজকালকার দিনে?’
লজ্জা পেলেম কথা শুনে;
বললেম, ‘কালই দেব ভর্তি করে বেথুনে ৷’
ইস্কুলে তো গেল,
কিন্তু ছুটির দিন বেড়ে যায় পড়ার দিনের চেয়ে ৷
কতদিন স্কুলের বাস অমনি যেত ফিরে ৷
সে চক্রান্তে বাপেরও ছিল যোগ ৷ ৷
ফিরে বছর মাসি এল ছুটিতে;
বললে, ‘এমন করে চলবে না!
নিজে ওকে যাব নিয়ে,
বোর্ডিঙে দেব বেনারসের স্কুলে—
ওকে বাঁচানো চাই বাপের স্নেহ থেকে ৷’
মাসির সঙ্গে গেল চলে ৷
অশ্রুহীন অভিমান নিয়ে গেল বুক ভ’রে
যেতে দিলেম ব’লে ৷ ৷
বেরিয়ে পড়লেম বদ্রিনাথের তীর্থযাত্রায়,
নিজের কাছ থেকে পালাবার ঝোঁকে ৷
চার মাস খবর নেই ৷
মনে হল, গ্রন্থি হয়েছে আলগা গুরুর কৃপায় ৷
মেয়েকে মনে-মনে সঁপে দিলেম দেবতার হাতে—
বুকের থেকে নেমে গেল বোঝা ৷ ৷
চার মাস পরে এলেম ফিরে ৷
ছুটেছিলেম অমলিকে দেখতে কাশীতে,
পথের মধ্যে পেলেম চিঠি...
কী আর বলব,
দেবতাই তাকে নিয়েছে ৷ ৷
যাক সে-সব কথা ৷
অমলার ঘরে বসে সেই আখোলা চিঠি খুলে দেখি,
তাতে লেখা—
‘তোমাকে দেখতে বডডো ইচ্ছে করছে ৷’...
আর কিছুই নেই ৷
৩১ শ্রাবণ ১৩৩৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন